ইউএপিএ-র মতো আইন মোদির শাসনামলের আগেও ছিল। তবে এটি ভিন্ন মতাবলম্বী ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের শায়েস্তা করার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে মোদির আমলে। আইনজীবী সুচিত্রা বিজয়ন ও সাংবাদিক ফ্রান্সেসকা রেচিয়ার লেখা বই ‘হাউ লং ক্যান দ্য মুন বি কেজড?’ বইয়ে এমন কয়েকজন ব্যক্তির গল্প তুলে ধরেছেন যারা মোদি ক্ষমতায় আসার পর ইউএপিএ বা অনুরূপ আইনে আটক হয়েছিলেন। তাঁদের মামলাগুলো একেকটা উদাহরণ এবং এসব মামলায় গ্রেপ্তার, সাক্ষ্য–সব নথিই সবার জন্য উন্মুক্ত। বইটি পড়লে মোদির শাসনব্যবস্থার ধারাকারা সম্পর্কে বোঝা যায়। যেমন রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, অবৈধ তল্লাশি ও জব্দ করা, ভিন্ন মতাবলম্বীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা, বিভ্রান্তি ছড়ানোর ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে চুপ রাখা ও গ্রেপ্তার হওয়াদের অপমান করতে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা ইত্যাদি।
![]() |
| নরেন্দ্র মোদি |
বইয়ের বিকে-১৬ পরিচ্ছদে বন্দীদের বর্ণনা এবং বিজয়ন ও রেচিয়ার পদ্ধতিগত গবেষণা মিলে ভিন্ন মতাবলম্বীদের অপরাধীকরণের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা সত্যিই ভয়াবহ। নিউইয়র্কভিত্তিক ভারতীয় লেখক সিদ্ধার্থ দেব তাঁর ‘টোয়াইলাইট প্রিজনার্স: দ্য রাইজ অব দ্য হিন্দু রাইট অ্যান্ড দ্য ফল অব ইন্ডিয়া’ বইয়ে লিখেছেন, ‘নাগরিক স্বাধীনতাকে খর্ব করার মোদির চেষ্টা এবং এক সময়ের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টার অপরিহার্য অংশ হচ্ছে বিকে-১৬ মামলা। ভারতীয় সমাজের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে দেবের বইয়ে। সিদ্ধার্থ দেব তাঁর বইয়ে ভারতের শহর ও রাস্তাগুলোর নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিমদের জীবন ও সংস্কৃতির চিহ্নগুলো মুছে ফেলার চেষ্টার সমালোচনা এবং হিন্দু ডানপন্থীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিশ্লেষণ করেছেন।’
সিদ্ধার্থ দেব তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘বেছে বেছে ও নিষ্ঠুর উপায়ে মোদি সরকার মুসলমানদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে এবং বিচ্ছিন্ন করেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন করে প্রতিবেশি দেশগুলো থেকে আশ্রয় নেওয়া মুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে ভারতের মধ্যবিত্তরা মোদির অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রশংসা করে। সিদ্ধার্থ দেব সতর্ক করে বলেন, ‘বাজার সব সময় বৃহত্তর সমতা ও গণতন্ত্রের প্রবেশপথ হতে পারে না। বরং এটা সহিংসতা ও এই মাটির স্পন্দন থেকে আমাদের বিচ্যুত করে।’
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সিদ্ধার্থ দেব হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সঙ্গে মোদির দীর্ঘকালের সম্পর্ক যাচাই করেছেন। আরএসএস আগামী বছর শতবর্ষ উদ্যাপন করবে। এটি একটি জঙ্গি সংগঠন যার প্রতিষ্ঠাতারা জার্মানির নাৎসি ও ইতালির ফ্যাসিস্টদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। (ওই নেতাদের বইয়ে ও বিভিন্ন বক্তৃতায় অ্যাডলফ হিটলার ও বেনিত্তো মুসোলিনির প্রশংসামূলক অনুচ্ছেদ রয়েছে)। ১৯৭০-এর দশকে আরএসএসে যোগ দেন মোদি। দেব লিখেছেন, ‘আরএসএস–কে দেখা যায় ধর্মীয় পোশাকে নিজেকে আচ্ছাদিত রাখতে। তারা অন্যান্য ধর্মকে কার্যত অস্বীকার করে। সংগঠনটি বৈচিত্র্য ও ভিন্নমতের বিপরীতে নির্মমভাবে কর্তৃত্ববাদী।’গত এক দশকে ভারতের অর্থনীতি বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। অন্যদিকে বৈষম্যও বেড়েছে। মোদি জানেন, ভারতীয়দের আকাঙ্খা পূরণ করা কঠিন, তাই তাঁর সরকার ধর্মীয় আগুন লাগিয়েছেন। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ অন্যান্য অগ্রাধিকারকে অগ্রাহ্য করে এবং বিজেপির খারিজ করার রাজনীতি কারণে সুবিধাবঞ্চিতরা সুবিধাভোগীদের কাছে মার খায়। মোদি যে হিন্দুত্ব প্রকল্পে বিশ্বাস করেন, সেটি দামোদার বিনায়ক সাভাকরের মতো নতুন আইকন তৈরির ওপর নির্ভর করে। আর সাভারকারের রাজনীতি ঠিকই মহাত্মা গান্ধীর রাজনীতির বিপরীত।
গান্ধী একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু, তবে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করতেন। তিনি ‘হিন্দ স্বরাজ’ (১৯০৯) নামের একটি বইয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। বইটি এখন আধুনিকতা, প্রযুক্তির বিপদ, গ্রামীণ জীবনের গৌরব, ঐতিহ্য উদ্যাপন ও আধ্যাত্মিকতার নিরিখে বিস্ময়করভাবে সেকেলে হিসেবে পড়া হয়।
সাভারকার তাঁর ‘এসেনশিয়াল অব হিন্দুত্ব’ (১৯২২) বইয়ে হিন্দু ধর্মের পেশীশক্তি ও সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। বইটিতে ভারতের পতনের জন্য বহিরাগতদের বিশেষ করে মুসলিম আক্রমণকারী ও ব্রিটিশদের দায়ী করা হয়েছে। বিদেশি প্রভাবমুক্ত বিশুদ্ধ ভারত খুঁজতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, প্রকৃত ভারতীয় তারাই যারা ভারতকে তাদের পিতৃভূমি ও পূণ্যভূমি মনে করে।

Post a Comment